২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ. ১১ই জুলাই, ২০২০ ইং

মৃত্যুর আড়াই মাস পর সাক্ষী দিলেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রউফ

স্টাফ রিপোর্টার:

বিশ লাখ টাকা ঘুষ চেয়ে না পাওয়ায় মৃত ব্যাক্তি, দেশের বাইরে থাকা লোককে স্বাক্ষী করে একটি হত্যা মামলার সম্পূরক চার্জশীট দেয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশ ব্যুরো ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই) এর ইন্সপেক্টর মোঃ হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে। একই মামলায় ২৪ জন স্বাক্ষী আদালতে হলফনামা দিয়ে বলেছেন তারা কোন স্বাক্ষ্য না দিলেও তাদেরকে স্বাক্ষী হিসেবে দেখিয়েছেন তদন্তকারী ওই কর্মকর্তা।

রোববার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন নবীনগর উপজেলার বিদ্যাকুট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান ভূইয়া। তিনি ২০১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে নবীনগর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের বাঘাউড়া গ্রামে খুন হওয়া আল-আমিন-(২২) হত্যা মামলার ৬ নম্বর আসামী।

সংবাদ সম্মেলনে সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান ভূইয়া অভিযোগ করে বলেন, ডিআইজিসহ সকল উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগনকে দেয়ার কথা বলে পিবিআই’র ইন্সপেক্টর মোঃ হারুনুর রশিদ তার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন। এছাড়াও তিনি দু-বার ঘুষ বাবদ পিবিআই’র ওই কর্মকর্তাকে ৬০ হাজার টাকা প্রদান করেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আবদুল হান্নান ভূইয়া বলেন, হত্যা মামলায় পিবিআই’র তদন্তকারী কর্মকর্তা মোট ৩৯ জনের জবানবন্দী গ্রহন করেন এরমধ্যে বিদ্যাকুট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রউফ-(৭৩) অন্যতম। ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর আবদুর রউফ ইন্তেকাল করলেও স্বাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দী নেয়ার তারিখ দেখানো হয়েছে ২০১৯ সালের ৩১শে জানুয়ারী। অর্থাৎ তার মৃত্যুর ২ মাস ২৯ দিন পর তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। আরেকজন স্বাক্ষী উপজেলার মেরাকুটা গ্রামের অজন্ত কুমার ভদ্র-(৬৬)। তার স্বাক্ষ্য গ্রহনের তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারী। কিন্তু তিনি বৈধপাসপোর্টে ২০১৯ সালের ৯ই জানুয়ারী ভারত যান। সেখান থেকে দেশে ফেরেন ৮ই ফেব্রুয়ারী । আরো ২৪ জন স্বাক্ষী আদালতে এফিডেভিট জমা দিয়েছেন এই বলে যে তারা পিবিআই’র ওই কর্মকর্তার কাছে কোন রকম স্বাক্ষীই দেননি।

নবীনগর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের বাঘাউড়া গ্রামে ২০১৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারী রাতে আল আমিন-(২২) নামে এক যুবক খুন হয়। এ ঘটনায় নিহতের পিতা জেলার কসবা উপজেলার খাড়েরা ইউনিয়নের সোনারগাও গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বাদী হয়ে নবীনগর থানায় ১০ জনকে এজাহারনামীয় এবং ২/৩ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় পাশ্ববর্তী সেমন্তঘর গ্রামের আবদুল হান্নান ভূইয়া, তার ছেলে পলাশ(ইফতেখার মাহমুদ)সহ মোট ৫ জনকে আসামী করা হয়। হত্যা মামলাটির সর্বশেষ তদন্ত করে পিবিআই।

এর আগে প্রথমে সিআইডি এবং এরপর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ এই মামলার তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এই দুটি সংস্থার তদন্তে প্রকাশ পায় আবদুল হান্নান ভূইয়ার সাথে আল আমিনের ভগ্নিপতি জাকির হোসেনের জমি-জমা সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধ রয়েছে। আবদুল হান্নানকে শায়েস্তা করতে নিজের শ্যালককে হত্যা করে জাকির হোসেন। এরপর আবদুল হান্নান, তার ছেলেসহ ১০ জনকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। দুটি সংস্থার অভিযোগপত্রে বলা হয় ঘটনার আগের দিন ২০১৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারী নিহতের স্ত্রী ইতির নানা বাড়িতে দাওয়াত খেতে যায় আল আমিনের ভগ্নিপতি জাকির ও তার সহযোগী শাওন, বিল্লাল ও মোবারক। খাওয়ার পর জাকির ইতিকে ঘুমের ঔষধ মিশ্রিত দুটি সিঙ্গারা খেতে দিয়ে আল আমিনকে নিয়ে পাশের বাড়িতে নাছির ফকিরের মাহফিলে চলে যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে তাকে হত্যা করে। এরপর লাশ গ্রামের একজনের বাড়িতে ফাস দিয়ে ঝুলিয়ে রাখে।

দীর্ঘ তদন্ত, স্বাক্ষ্য-প্রমান এবং স্বাক্ষীদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর প্রেক্ষিতে সিআইডি এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশ জাকির হোসেন-(৩৮), তার সহযোগী বিল্লাল-(৩৭), শাওন ওরফে রানা-(৪২), মোবারক মিয়া-(৩৬) এঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগপত্র দেয়। অন্যদিকে পিবিআই এই ৪ জনকে নির্দোষ বলে তাদের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন। এমনকি সিআইডি’র প্রথম দিকের তদন্তে ঘটনায় জড়িত বলে যে ৬ জনের নাম প্রকাশ পায় তাদেরকে স্বাক্ষী বানিয়ে অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই।সাংবাদিক সম্মেলনে পিবিআই কর্মকর্তা হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন আবদুল হান্নান ভূইয়া।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ ব্যুরো ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই) এর ইন্সপেক্টর মোঃ হারুনুর রশিদের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তিনি দীর্ঘ তদন্তে যা পেয়েছেন সে মোতাবেকই আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছেন। ২০ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমার দেয়া অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করে আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেছেন। তিনি বলেন, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান ভূইয়া তদন্তে অভিযুক্ত হওয়ার তিনি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলেছেন। মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষ্য কিভাবে গ্রহণ করলেন এধরনের প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রায় ৫ মাস আগের ডকেট আমার সামনে নেই। আমি যা করেছি সবই সত্য। আদালতে তার প্রমান হবে।