১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ. ২৩শে এপ্রিল, ২০২১ ইং

আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগ-যুবলীগের বিরোধ চরমে!

স্টাফ রিপোর্টার, 
অভ্যন্তরীন কোন্দলে জর্জরিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ। দ্বিধা-বিভক্ত হয়েই চলছে এখন সংগঠন দুটোর কার্যক্রম। উপজেলা আওয়ামীলীগের বিভিন্ন ইউনিটের মেয়াদ উত্তীর্ণের আগেই সম্মেলনের ঘোষণা নিয়ে উপজেলা আওয়ামীলীগের দুই গ্রুপের বিরোধ এখন চরম আকার ধারন করেছে। অপর দিকে উপজেলা যুবলীগের নতুন কমিটি গঠন নিয়েও চলছে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ ও সরাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২- আসন। আওয়ামীলীগের দলীয় কোন্দলের কারনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি মহাজোটের হাতছাড়া হয়। নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মহাজোট থেকে প্রথমে মনোনয়ন পান অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধার জামাতা ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ভূইয়া। পরে মনোনয়ন পরিবর্তন করে মহাজোট থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধাকে।
নির্বাচনে ওই আসনে আওয়ামী লীগ কোনো প্রার্থী না দিলেও জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঈন উদ্দিন মঈন নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে কলার ছড়ি প্রতিক নিয়ে নির্বাচন করেন। দলীয় কোন্দলের কারনে বিএনপির প্রার্থীর কাছে তিনি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে হেরে যান। অপর দিকে শ্বশুর-জামাইয়ের দ্বন্দ্বে হেরে যান ‘মহাজোট’ মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধাও।

এই আসনে বিজয়ী হন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী উকিল আবদুস সাত্তার ভূইয়া। এই আসন থেকে বিএনপি নেত্রী ব্যারিষ্টার রুমিন ফারহানা দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। পরে তিনি সংরক্ষিত মহিলা আসনে বিএনপির এমপি মনোনীত হন।

এদিকে গত বুধবার দুপুরে আশুগঞ্জের উজানভাটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ। সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক ছফিউল্লাহ মিয়ার বিরুদ্ধে আগস্ট মাস জুড়ে শোক দিবসের কোনো কর্মসূচী পালন না করা, মেয়াদ থাকার পরও একগুয়েমিভাবে বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটি ভাঙ্গার একক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় অপর অংশের নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম আহবায়ক-১ আবু নাছের আহমেদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তোফায়েল আলী। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ছফিউল্লাহ মিয়া কারো সাথে কোনো পরামর্শ ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে শোকের মাসে (২৫ আগস্ট) উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটির সভা ডাকেন। সভায় উপজেলার সকলকে আমন্ত্রন জানানো হলেও উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি মিলিয়ে প্রায় নয়টি ইউনিটের মোট ৬১ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ১৩ জন উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটির নেতাকর্মীরা ওই সভা বর্জন করেন। ওই সভায় শোকের মাসে উপজেলার সকল ইউনিয়ন কমিটির সম্মেলন ঘোষণা করে শহীদদের প্রতি উপহাস করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১৭ সালের মে মাসে ছফিউল্লাহ মিয়ার নেতৃত্বে উপজেলা আওয়ামী লীগের সকল ইউনিটের (আটটি ইউনিয়ন ও আশুগঞ্জ বন্দর) ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যাদের মেয়াদ ২০২০ সালের মাসে মাসে শেষ হওয়ার কথা। মেয়াদ শেষ হওয়ার আরো অন্তত ১১ মাস থাকার পরও সম্মেলনের ঘোষণা দেয়া অগণতান্ত্রিক ও আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র পরিপন্থি। সম্মেলন করা হলে উপজেলার আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলা হয়, উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক ছফিউল্লাহ মিয়া বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত কোনো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি। এছাড়াও গত জাতীয় নির্বাচনে ছফিউল্লাহ মিয়া প্রকাশ্যে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনের সাংসদ উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়ার পক্ষে ভোট চেয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৩ সালে উপজেলা সম্মেলনে ছফিউল্লাহ মিয়াকে সভাপতি ও হানিফ মুন্সীকে সাধারণ সম্পাদক করে দুই বছরের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে ছফিউল্লাহ মিয়া ২০১৪ সালে সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ছফিউল্লাহ মিয়াকে আহবায়ক করে ৬১ সদস্যের একটি আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করে জেলা আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ চার বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলছে কার্যক্রম।

তবে ছফিউল্লাহ মিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘শোক দিবসে বিভিন্ন মসজিদে দোয়া পড়ানো হয়েছে। সভা ডাকলে ইউনিয়ন কমিটির নেতারা আসেন নি। তাঁরা যেহেতু দলের বাইরে কাজ করছেন সেহেতু তাদেরকে রাখব কেন? আমরা সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।

এদিকে উপজেলা যুবলীগের কমিটি ঘোষণার পর থেকেই আশুগঞ্জে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ২৫ আগস্ট এক পক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে নতুন কমিটিকে প্রত্যাখান করেছেন। নতুন ঘোষিত কমিটি বাতিল না করা হলে লাগাতার কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। গত ২৭ জুলাই একই দাবিতে বিক্ষোভ করা হয়। এসময় পাল্টা কর্মসূচি পালন করে নতুন কমিটি।

আশুগঞ্জ প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত যুবলীগের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিলুপ্ত ঘোষিত কমিটির আহবায়ক মোঃ জিয়াউদ্দিন খন্দকার। এ সময় তিনি বলেন, ১৬ বছর ধরে জেলা যুবলীগ সম্মেলন করতে পারে না। অথচ আশুগঞ্জে চার বছর ধরে সম্মেলন হয় না বলে কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের গঠিত আমাদের আহবায়ক কমিটির নির্দেশনা অনুসারে ইউনিয়ন সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হয়। ইউনিয়ন কমিটি করে কাউন্সিলরের তালিকা কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুল রহমানের কাছে জমা দেয়া হয়। কেন্দ্র থেকে বলা হয়, জেলার সঙ্গে সমন্বয় করে সম্মেলন করার জন্য। কিন্তু জেলা নেতৃবৃন্দকে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অবহিত করা হলেও সম্মেলনের তারিখ দিতে গড়িমসি করেন।’ এ অবস্থায় নতুন কমিটি করা স্বেচ্ছাচারি আচরণ বলে তিনি অভিযোগ করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট আশুগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। গত ২৪ জুলাই ওই কমিটি বিলুপ্ত করে মোঃ সাইফুর রহমান মনিকে আহবায়ক করে ২৭ সদস্য বিশিষ্ট নতুন কমিটি করে জেলা যুবলীগ।
এ ব্যাপারে জেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ সিরাজুল ইসলাম ফেরদৌস বলেন, ‘চার বছর আগে তিন মাস মেয়াদি আশুগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি সম্মেলন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে পরামর্শ করে এখন আমরা নতুন কমিটি কমিটি দিয়েছি। আগের কমিটির নেতারা এখন যুবলীগে নেই।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আল-মামুন সরকার বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আশুগঞ্জে দলের মাঝে বিরোধ দেখা দেয়। যে কারণে এখন ঐক্যবদ্ধভাবে একটি সম্মেলন করার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। ওই আসনে বিএনপি’র দুই সংসদ সদস্য থাকায় দলকে আরো সু-সংগঠিত হওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।