৩০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ. ১৪ই জুলাই, ২০২০ ইং

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা , ১০ পদ খালি

স্টাফ রিপোর্টার,
দালাল ও বে-সরকারি এ্যাম্বুলেন্স মালিকদের দৌরাত্ম, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও শষ্যা না থাকায় ২৫০ শষ্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে রোগীরা কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে এই হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ ও অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ না থাকায় রোগীদেরকে বিপুল টাকা খরচ করে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ৫৭জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলে বর্তমানে রয়েছে ৪৭জন চিকিৎসক। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের দুইজন শিশু বিশেষজ্ঞ, ১জন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও ১জন অর্থপেডিকস বিশেষজ্ঞের পদ খালি রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বর্তমানে প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ১ হাজার ২শত থেকে দেড় হাজার রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। এর মধ্যে তিন থেকে সাড়ে তিনশত রোগীকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ২৫০ টি শয্যা থাকায় বাকী রোগীকে হাসপাতালের ফ্লোরে চাটাই ফেলে থাকতে হয়। হাসপাতালের সব চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দালাল।

প্রতিদিন সকাল ৮টার পর থেকেই চিহ্নিত দালালরা এসে হাসপাতাল কম্পাউন্ডে জড়ো হয়। রোগীরা টিকেট কাটার জন্য কাউন্টারে দাঁড়ালে অনেক সময় রোগীবেশী চোরেরা তাদের পকেট থেকে টাকা পয়সা নিয়ে যায়। এছাড়া দালালদের খপ্পরে পড়ে গ্রামের সহজ-সরল লোকেরা বিভিন্ন সময় প্রতারিত হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দালালদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হলেও হাসপাতালে কমছেনা দালালদের দৌরাত্ম। অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কয়েকজন কর্মচারী এই দালালীর সাথে জড়িত। এছাড়া হাসপাতালে রয়েছে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম। তারা ডিউটি চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন চিকিৎসকের চেম্বারে বসে চিকিৎসকদের বিভিন্ন ধরনের উপহার দিয়ে তাদের কোম্পানীর ঔষধ লিখতে প্রভাবিত করেন। বিক্রয় প্রতিনিধিরা রোগীদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে টানাটানি করে।

জেলা সদর হাসপাতালে রয়েছে প্রাইভেট এ্যাম্বুলেন্স মালিকদের সিন্ডিকেট। হাসপাতাল কম্পাউন্ডে থাকা নার্সিং ইনস্টিটিউটের এ্যাম্বুলেন্স চালক মোঃ রফিকের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন। তারা রোগীদের কাছ থেকে নিজেদের মনগড়া মতো ভাড়া আদায় করেন। সিন্ডিকেটের কারনে কেউ ইচ্ছে করলে বাইরে থেকে এ্যাম্বুলেন্স এতে রোগী পরিবহন করতে পারেনা। এছাড়া হাসপাতালে রয়েছে রক্ত ব্যবসায়ী গ্রুপ। ২০/২৫ জন রক্ত ব্যবসায়ী
রোগীদের কাছে চড়া দামে তাদের শরীরের রক্ত বিক্রি করে। এই রক্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে অধিকাংশই মাদকসেবী।

সরজমিনে হাসপাতালে ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের বাথরুমগুলোর অবস্থা একেবারেই করুন। পর্যাপ্ত লাইটিংয়ের অভাবে রাতের বেলা হাসপাতালে ভূতুরে অবস্থার সৃষ্টি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রোগী ও তাদের আত্মীয় স্বজন জানান, হাসপাতালের বাথরুমগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। বাথরুম গুলোতে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায়না ও প্রতিনিয়ত পরিষ্কার করা হয়না। তারা বলেন, হাসপাতাল থেকে ৩০ প্রকার ঔষধ বিনামূল্যে সরবরাহ করার কথা থাকলে ১০/১২ প্রকার ঔষধ সরবরাহ করা হয়। তাই তাদেরকে বেশীর ভাগ ঔষধ বাইরের ফার্মেসী থেকে কিনতে হয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিদিন হাসপাতালে বিভিন্ন বয়সের নারী ও পুরুষ মিলে ৭০/৮০জন দালাল কাজ করে। তারা রোগীদের সাথে ভাব জমিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যায়। এর বিনিময়ে তারা প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে পায় মোটা অংকের কমিশন। হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর বেশ কয়েকজন কর্মচারীও এই দালালীর সাথে জড়িত।

দালালের খপ্পরে পড়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার নাসিরপুর গ্রামের দুলাল মিয়া জানান, তিনি গত ২০ জুন হাসপাতালে আসার পর দালালের খপ্পরে পড়েন। হাসপাতালে ভালো চিকিৎসক নেই বলে দালালরা তাকে একটি বে-সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে দালালের খপ্পর থেকে রক্ষা পান। একই উপজেলার আজগর মিয়া জানান, চোখের চিকিৎসা করাতে তিনি হাসপাতালে কয়েকদফা এসেছেন, কিন্তু হাসপাতালে চোখের ডাক্তার না থাকায় তিনি চোখের চিকিৎসা করাতে পারেননি।

এ ব্যাপরে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ শওকত হোসেন জানান, হাসপাতালে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। টিকেট কাউন্টারের জায়গা ছোট হওয়ায় রোগীরা টিকেট কাটতে কষ্ট করে। তিনি বলেন, হাসপাতালে ৫৭জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছে ৪৭জন। হাসপাতালে কোন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও অর্থপেডিকসের চিকিৎসক নেই। এছাড়াও দুইজন শিশু চিকিৎসকের পদ খালি আছে। তিনি বলেন, প্রতি মাসে গড়ে হাসপাতালে ৯০ থেকে ১০০টা সিজারিয়ান অপারেশন করা হচ্ছে। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪শত রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে, গড়ে প্রতিদিন ভর্তি হচ্ছে তিন থেকে সাড়ে তিনশত রোগী। তিনি বলেন, হাসপাতালের দুইটি এ্যাম্বুলেন্স আছে। বাইরে থেকেও প্রাইভেট এ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী পরিবহন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, হাসপাতালে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী রোগী ও তাদের স্বজনরা থাকায় বাথরুম গুলোর উপর চাপ পড়ছে। এছাড়া বাথরুমগুলো পুরানো হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। বাথরুমগুলো সংস্কার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসকগন নিয়মিত ডিউটি করেন।

ডাঃ শওকত হোসেন আরো বলেন, হাসপাতালে ৩০ ধরনের ঔষধ রোগীদেরকে বিনা মূল্যে দেয়া হচ্ছে এছাড়া বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধিদেরকে সপ্তাহে দুইদিন রবিবার ও বুধবার দুপুর ১২টার পর ভিজিট করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, বেডের চেয়ে বেশী রোগী ভর্তি থাকায় কিছু রোগীকে ফ্লোরে থাকতে হয় তবে কিছুদিনের মধ্যে হাসপাতালে আরো ৭০টি বেড বিছানো হলে এই সমস্যা কেটে যাবে। তিনি হাসপাতালে আরো ভবন বৃদ্ধি করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান।