Advertisement

পঁয়তাল্লিশ বছরেও মেলেনি মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি

NewsBrahmanbaria

এই আর্টিকেল টি ১২০৪।

এনবি ডেস্ক:

ওয়াজেদ আলী। ঠিকানাবিহীন একজন মুক্তিযোদ্ধা। যিনি স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই যোদ্ধার লড়াই এখনো চলছে। ক্যান্টনমেন্ট, মন্ত্রণালয়, এই টেবিল, ওই টেবিল ঘুরেও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করতে পারছেন না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার বাঙ্গরা ইউনিয়নের দীঘিরপাড়ের মৃত বজলুর রহমান ও আয়াজুন্নেছার ছেলে। তিনি ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে। দায়িত্ব পালন করতেন গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তিনি সেনাবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন এএসএম নাসিম(বীর বিক্রম) এর নেতৃত্বে থাকা কোম্পানিতে যোগ দেন। এএসএম নাসিম পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান হিসেবে অবসরে যান।

২৫ মার্চের পর ৩নং সেক্টরের তৎকালীন সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এএসএম নাসিমের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে। প্রতিরোধ যুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন। প্রতিরোধ যুদ্ধ শেষে ভারতে পুনঃসংগঠিত হওয়ার পর তৎকালীন নায়েক (কর্পোরাল) ওয়াজেদ আলী ৩ নম্বর সেক্টরের পঞ্চবটি সাব-সেক্টরের সেকশন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে কেএম শফিউল্লাহ (বীর উত্তম) এর নেতৃত্বাধীন নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর ‘এস’ ফোর্সের অধীন ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোয়ার্টার মাস্টার নিযুক্ত হন। আশুগঞ্জ, মনতলা, মাধবপুর , শাহবাজপুর ও চান্দুরার যুদ্ধ তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান এবং তৎকালীন বিডিআর এ যোগদান করেন। তিনি বিডিআর থেকে ২০০৪ সালে অবসরে আসেন।

১৯৬৬ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি পর্যন্ত আত্মীয় ও গ্রামবাসীর কাছে তিনি ছিলেন নিখোঁজ। সবার ধারণা ছিলো তিনি মারা গেছেন। এক শীতের রাতে তিনি তাঁর শ্বশুরবাড়ি বাঞ্ছারামপুরের দড়িকান্দিতে গিয়ে সহধর্মিণীর সঙ্গে দেখা করেন। দেশ স্বাধীন না করে ফিরবেন না বলে বিদায় নেন প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছ থেকে। ফিরে আসেন সেই রণাঙ্গনে। তবে ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীনের পরও তিনি বাড়ি ফিরতে পারেন নি। বেসামরিক যোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ জমা নেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত হোন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এর পর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী বাড়ি ফেরেন।

একাত্তরে ছদ্মবেশে রেকি, এমবুশ ও গেরিলা এট্যাকের জন্য তাঁর বেশ সুনাম ছিলো। তিনি ভারি অস্ত্র চালনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। একাত্তরে এএসএম নাসিম(বীর বিক্রম) পাক বাহিনীর গুলিতে আহত হলে এই ওয়াজেদ আলী গ্রামবাসীর কাছ থেকে মই সংগ্রহ করে এএসএম নাসিমকে কাঁধে করে পায়ে হেঁটে ভারতে নিয়ে যান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলীর ভারতীয় তালিকায় নাম ও তৎকালীন পদবীর উল্লেখ আছে। তবে পিতার নাম, বিস্তারিত ঠিকানা লেখা নেই। আর এই বিষয়টির জন্য স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও তাঁর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি।

তার পূর্নাঙ্গ ঠিকানা না পাওয়ায় গত ১৮ আগস্ট ২০১৯ কুমিল্লা জেলা প্রশাসন তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী বেশ কয়েকবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সচিবকে বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে বলেছেন।

১৯৭১ সালে সামরিক যোদ্ধার মধ্যে ৮৮০৬৮৬১ নম্বর ধারী ওয়াজেদ আলী নামের নায়েক (বর্তমান কর্পোরাল) পদবির একজনই আছেন। আর সেই ওয়াজেদ আলী নামক যোদ্ধাটি এখনো মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা বঞ্চিত। উক্ত নম্বরের একজন ওয়াজেদ আলীই দাবি করছেন তিনিই সেই মুক্তিযোদ্ধা নায়েক ওয়াজেদ আলী। তৎকালীন সাব-সেক্টর কমান্ডার এএসএম নাসিম জীবিত আছেন। তিনি বলছেন- এই ওয়াজেদ আলীই আমাদের একাত্তরের রণাঙ্গনের সেই ওয়াজেদ আলী। তারপরও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। আইন, অযুহাতের যাঁতাকলে আটকে আছে একজন বীরের সনদ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামীলীগ এর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আল মামুন সরকারও এই ওয়াজেদ আলীর রণাঙ্গনের সহযোদ্ধা ছিলেন। আল মামুন সরকার এই মর্মে লিখিত দিয়েছেন। রাষ্ট্রের কাছে আবেদন করেছেন ওয়াজেদ আলীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান বুঝিয়ে দিতে।

অশীতিপর বৃদ্ধ বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলীর সন্তনেরা প্রতিষ্ঠিত। সংসার জীবনে সুখি ও ধার্মিক এই মানুষটির সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি বলেন- “দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। কিছু পাবার আশায় করিনি। কিন্তু রাষ্ট্র যখন সবাইকে স্বীকৃতি দিলো, আমার মতো কিছু যোদ্ধা নানান অযুহাতে বাদ পড়ে তখন ভীষণ পোড়ায় বিষয়টি। অনুজ কাউকে যুদ্ধের গল্প করতে গেলেও গলা জড়িয়ে আসে। বার বার মনে হয়- আমারতো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই।”

জানি না মৃত্যুর আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজেদ আলী তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু পাবেন কিনা। এদেশে অনেকে মুক্তিযুদ্ধ না করেও সনদ নিয়ে নিয়েছিলেন। হয়তো তাদের জন্যই সরকার এখন অতী সতর্ক। কিন্তু এই অতী সতর্কতা ও নানান অযুহাতে যদি ওয়াজেদ আলীর মতো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হোন তাহলে আমরা কি নিজেদের ক্ষমা করতে পারবো?ত হোন তাহলে আমরা কি নিজেদের ক্ষমা করতে পারবো?

লেখক-মাহমুদুর রহমান,

্অনলাইন এক্টিভিস্ট  

Advertisement

Sorry, no post hare.

Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com