৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ. ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং

গ্রাম জুড়ে নৃশংসতার ছাপ, এখনো গ্রেফতার হয়নি পা কেটে উল্লাস ও হত্যার মূল নায়ক কবির চেয়ারম্যান ও কাউসারমাষ্টা

স্টাফ রিপোর্টার:

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ধ্বংস স্তুপের উপর বসে বিলাপ করছিল সত্তোর্ধ্ব বয়সী জাহানারা বেগম। ছেলের কষ্টাজির্ত টাকা দিয়ে গড়া একমাত্র ঘরটি পুড়ে ছাই করে দিয়েছে প্রতিপক্ষের লোকজন। চারলাখ টাকা খরচে ঘরটি বেঁধে ছিলেন। ঘরে নতুন আসবাপত্রও জুড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু বর্বরতার হামলা তার সে ঘরকে আর ঘর রাখে নাই তা এখন ধ্বংসস্তুপ। ঘরের চারদিকে পুড়ে যাওয়া টিন আর কয়লার গুড়া। জাহানারার মত আরো অনেকেই তাদের সহায় সম্বল হারিয়ে এখন নি:স্ব।

বলছিলাম লন্ড ভন্ড এক গ্রাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের উত্তর লক্ষীপুর হাজিরহাটি গ্রামের কথা। কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের হাজিরহাটি, থানাকান্দি,সাতঘরহাটি ও গৌরনগর এই চারটি গ্রামে ১৯৮৬ সাল থেকে গ্রাম্য আধিপত্য নিয়ে চলে আসছে বিরোধ। এই বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হয় ২০১১ সালে পার্শ্ববর্তী বীরগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কবির আহমেদ এর যোগদান এর মাধ্যমে। স্থানীয়দের অভিযোগ কবির চেয়ারম্যান তার ব্যাক্তিগত ফায়দা হাসিলের জন্য এই দাঙ্গা লাগিয়ে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১২ এপ্রিল ওই গ্রামে চলে এই বর্বর হামলার ঘটনা। ওই হামলাই মোবারক নামের এক ব্যাক্তির পা কেটে হয়েছে মধ্যযুগীয় উল্লাস। দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন পা নিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে সারা গ্রামে করেছে মিছিল। এমন নৃশংস ঘটনারা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে সারা দেশে শুরু হয় তোলপাড়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাম জুড়ে ভয়াল নৃশংসতার ছাপ। কোথাও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। আবার কোথাও তান্ডব চালিয় তছনস করে দিয়েছে বসত ভিটা। চালানো হয়েছে লুটতরাজ। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে ঠাঁই নিয়েছেন আত্মীয় স্বজনের বাসায়।যেন এক অজানা আতংক তাদের ঘিরে রেখেছে।

স্থানীয়রা জানায়, কোথাও সারিবদ্ধ ভাবে ছয়টি, কোথাও দুটি, আবার কোথাও একটি এমন করে প্রায় অর্ধশত বাড়িঘর ভাংচুর ও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে ১২ এপ্রিলের ঘটনায় । এমন কি বাড়ির আশপাশে থাকা ফলদ ও বনজ গাছপালাও তাদের আগুন থেকে রক্ষা পায় নি। এ যেন জাহেলিয়া যুগের বর্বরতা।

কথা হয় হামলায় দুই ঘর হারানো বৃদ্ধ শিশু মিয়ার সাথে। তিনি সেই ভিষীশিকাময় ১২ এপ্রিলে বর্ণনা দিতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত চোঁখে বলেন, আধিপত্য নিয়ে কাউসার মোল্লা ও কাউসার মাষ্টার এর নেতৃত্বে পাঁচগ্রামের লাঠিয়াল বাহিনী দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় হাজিরহাটি গ্রামে। মুহূর্তে তাড়া ঝাঁপিয়ে পড়ে তছনস করে দেয় বাড়িঘর। নির্বিচারে হামলা চালায় সবার উপর। চোখের সামনে বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দিলেও অসহায় হয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না। আমার জীবনের রোজগার ও তিনছেলের আয়ের টাকা দিয়ে দুটি বসত ঘর তৈরী করেছিলাম। কয়েকশ লাঠিয়াল বাহিনী আমার দুটি ঘরে হামলা চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে ঘরে থাকা সব কিছু জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

পা হারিয়ে নিহত হওয়া মোবারেকের ভাই জালালের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ভাইয়ের উপর হামলার খবর শোনে দিশেহারা হয়ে ছুটলেও কিছু করার ছিল না। দুর থেকে ভাইয়ের আর্তনাদ শুনেছি। কিন্তু এগিয়ে যেতে সাহস পায় নি। আমার ভাই জীবন বাঁচানোর জন্য অন্যের বাড়িতে পালিয়ে আশ্রয় নিলেও সেখানেও তার শেষ রক্ষা হয় নি। দাঁড়ালো অস্ত্রের কুপে দেহ থেকে একটি পা বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যায়। তারা আমার ভাইয়ের কাটা পায়ের অংশ নিয়ে গ্রাম জুড়ে উল্লাসে মেতে ওঠে। আমার ভাই ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সাথে ৪ দিন পাঞ্জা লড়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। আমি এই নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার চাই।এই বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের মূল নায়ক কবির চেয়ারম্যান ও কাউসার মাষ্টারকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলি।

ঘরের এক কোনায় একমাত্র সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিহত মোবারকের স্ত্রী সাফিয়া বলেন, তারা আমার স্বামীর পা কেটে নিয়ে তাকে হত্যা করেছে। আমি আমার স্বামীর হত্যা কারীদের বিচার চাই। বিচার হলেই আমার অশান্ত মন শান্ত হবে।

স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,এই ঘটনার মূল ইন্দনদাতা কবির চেয়ারম্যান কাউসার মোল্লা ও কাউসার মাষ্টার পুলিশ কাউসার মোল্লাকে গ্রেফতার করতে পারলেও কবির চেয়ারম্যান ও কাউসার মাষ্টারকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি। এই ঘটনার কঠিন বিচার না হলে এই এলাকায় শান্তি আসবে না।তিনি এই এলাকার শান্তি রক্ষায় সরকারে সুদৃষ্টি কামনা করেন।

নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রনোজিৎ রায় বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি ও নিহত মোবারকের স্ত্রী বাদি হয়ে একটি মামলা হয়েছে। এ দুটি মামলায় এখন পর্যন্ত ৬৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে।